করীম রেজা।।
হাত থেমে যায়। পকেট থেকে বের করতে গিয়েও বের করতে পারে না ।
নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে হাতেম চাচার দিকে ।
পকেটে, হাতের মুঠোর মধ্যে, অনন্ত টাকা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কি করবে।
হাতেম চাচা তখনো বলে চলেছে। তার ছেলেরা এবার আর খড়ের গাদা বিক্রি করতে দেবেনা। কেননা তারা ছোটখাটো কোনো কারখানা দিতে চায় । কৃষিকাজ আর নয়। বলেছে পরিশ্রমের ফসল লোকসান দিয়ে বেচতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি ।
বলছেন, তুমিতো বাবা প্রতিবছরই এই খেড়ের পারা কিইন্না রাখ। কিন্তু কিছু ত কর না। বছর শেষে অরে, ওরে ডাইকা আইনা এমনি বিলায় দেওন লাগে। হারাডা বছর রইদে বৃষ্টিতে পচে, গলে, হুগায়। তুমি তামশা দেহ। জিগাইলে কও, হ, চাচা, নিতাসি। নিমু ।
এইতো আর কয়টা দিন। এইরকম কইরা বছরের পর বছর পার করতাছো। কি লাভ, বুজি না। পাগলের কাম আর কী !
অনন্ত জবাব দেবে, নাকি চুপ করে থাকবে, এই বিষয়টা তার কাছে এখন বিরাট সমস্যা।
জীবনে এমন সমস্যায় কখনও পড়েছে বলে মনে আসে না।
জীবন শেষ পর্যন্ত জীবনের মতই তাকে চালিয়ে নিচ্ছে। গল্প, তার জীবনে অনেক গল্প, সেই গল্প তাকে টেনে নেয় আরেকদিকে। সেই সব কথা হাতেম চাচাকে সে কি করে বলে!
এতসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অনন্তর হাতে মুঠোতে টাকাগুলো ঘুরতে থাকে। ঘামতে থাকে হাতের তালু । শরীরটাও নিয়ন্ত্রণে নেই যেন। খুব দুর্বল লাগতে শুরু করে।
হাতেম চাচা আবারো বলে, যাও এইবার তোমার কোন টেহা দেওন লাগবো না। প্রত্যেক বছরই ত দেও। এইবার আমি তোমার কাছ থাইকা কোন টেহা নিমুনা। পোলাগো কথা, এইটাই ত শেষ বছর । তোমার পাগলামির জইন্ন এই সনে তোমারে আমি ফিরি দিলাম। তোমরা কি কও, এই বোনাস দিলাম।
এই বলে হাতেম চাচা কোন চিন্তা করতে মানা করে ঘুরে বাড়ির দিকে চলতে শুরু করে।
অনন্ত খড়ের গাদায় হেলান দিয়ে শরীরের, শরীরের ভেতরের অনুভব আস্তে আস্তে ঘষতে ঘষতে মাটিতে নিজের অজান্তেই সামনের দিকে পা ছড়িয়ে বসে পড়ে।
সামনে বিস্তীর্ণ বালুচর। মানুষেরা যেখানে বছরে একবার কি দুইবার ফসল ফলায়। সেই জমির পরে নদী। এই নদী কখনো নীরব, কখনো কুলু কুলু শব্দ করে, বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে চলতে থাকে । এই নদী কখনোই উত্তাল হয় না, গর্জন করে না। পাড় ভাঙ্গে না, শুধু বয়ে চলে । জীবনটা এক দিকে। গল্প,আর নদী মিলে অনন্তকে টেনে নেয় আরেক দিকে। যার খুব স্পর্শিক,আনুভূতিক শুরু আছে। কিন্তু শেষ এখনো অজানা, অশেষ কি! জীবনের সমান্তরাল হবেও বা। তবে গল্পের সমান্তরাল কিছুতেই নয়। এমনটাই মনে হয় অনন্তর।
একদিন খড়ের গাদায় পাশাপাশি বসে মনিকা সোজাসাপ্টা ভালবাসার কথা বলেছিল। অভাবনীয়। যা কোনওদিন অনন্ত স্বপ্নেও কল্পনা করেনি।
হেমন্তের পরিত্যক্ত আচষা জমি অনন্তর চোখে সেই সময় আনন্দের অফুরন্ত উৎস বলে মনে হয়েছিল।
মনিকা তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে এই কথা জানার পরে তার মনে হয়েছিল সামনে নিরবে বহমান নদীর বুকে অনন্ত যদি ভেসে যেতে পারত তাহলে জগতে সীমাহীন উল্লাসের ঢেউ চিরন্তন করে রাখতে পারত অনন্ত।
শুধু অমাবস্যার রাতে মনিকা অনন্তর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে খড়ের গাদায় লুকিয়ে এসে বসে থাকতো। অনন্তর সঙ্গে খুনসুটি, গল্প গাছা, কল্পিত সংসারের খুঁটিনাটি, না দেখা জীবনের সমস্ত বিষয় আশয় ফিসফিস করে বলে যেত। অনন্ত অবাক চোখে দেখার চেষ্টা করত আর শুধুই শুনত।
আর মনের চোখে ছবিগুলো সত্য-অসত্য ভাবতো । শুধু ভাবতো নয়, মনে হতো সামনের রুপালি নদীর জলের স্বচ্ছতা তাকে নিয়ে বয়ে যাচ্ছে । পাশের জমিতে কোন ফসল নাই। মনে হতো জমি ভর্তি পাকা ধান, কখনো মনে হত মিষ্টি আলু, কখনো মটরশুটি, কখনো চিনাবাদাম।
অন্ধকার কখন তার চোখে পূর্ণিমা রাত হয়ে গেছে। ভাসিয়ে দিয়েছে চরাচর। এভাবেই জীবন তাকে আস্তে আস্তে শুধু গল্পের আসরে টেনে নিয়ে যায়, মাতিয়ে রাখে সময়, সব সময়, দিন কিংবা রাত্রি।
একদিন হঠাৎ করেই মনিকা সংকেত পাঠায় সন্ধ্যার পরে দেখা করার জন্য। অনন্তর ভেতরে কোথাও কিছু হয়। কিন্তু বুঝতে পারে না, কী হল ! বুঝতে পারেনা হঠাৎ কি হল। অমাবস্যার তো এখনো অনেক দেরি । এই জোসনা রাতে সেখানে দেখা করতে যাওয়া খুব নিরাপদ নয়। যদিও জায়গাটি বাড়ির কাছেও নয় আবার খুব দূরেও নয়। তাছাড়া মনিকা এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতে কম যায়। তাহলে !
শঙ্কা ও আনন্দের স্পন্দন নিয়ে পূর্ণিমার আলো গায়ে মেখে পায়ে পায়ে অনন্ত ঠিক হাজির হয়। মনিকা তো এখনো আসেনি। অস্থিরতায় বারবার পথের দিকে নজর । ভীরু পায়ে কিছুক্ষণ পর মনিকা ঠিক ঠিক হাজির হয়। কোন কথা না বলে ঝুপ করে পাশে বসে। অনন্তর হাত দুটো টেনে নেয় নিজের মুঠোর ভেতর। ধরে রাখে শক্ত করে।
অনন্ত বারবার প্রশ্ন করে। মনিকা উত্তরে আরো শক্ত করে চেপে ধরে। কিন্তু কোন কথা বলে না। পূর্ণিমার চাঁদ সাক্ষী হয়ে থাকে। নদী, ফসলের ক্ষেত, খড়ের গাদা সাক্ষী হয়ে থাকে।
দুজন মানুষ যাদের কথা কখনো শেষ হতে চায় না। আর আজ তাদের মুখে কোন কথা নেই। স্পর্শ আছে, কোন আনন্দ নেই । চারদিকের মাটি বাতাস কেমন ভারী হয়ে ওঠে অসম্ভব নীরবতায়।
গাছের পাতায় পিছলে পড়া জোসনার আলো স্থির হতে পারেনা। কেবলই পিছলে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে, নেমে যায়, মিশে যায় নদীর জলে। কোন কথা হয়না, প্রশ্নের কোন জবাব পাওয়া যায় না।
এক সপ্তাহ পরে মনিকা অন্য ঘরে সংসারযাত্রা করে নদীর বুকে পানসিতে ভেসে।
Leave a Reply